Sfuron- The Words of Realization
Sunday, 24 March 2024
অহংকারী মানুষ কেন নিজের দোষ খুঁজে পায় না?
Friday, 4 November 2016
যেমন চালাও তেমনি চলি । যেমন বলাও তেমনি বলি ।।
যেমন চালাও তেমনি চলি । যেমন বলাও তেমনি বলি ।।
.
প্রসঙ্গঃ 'নিরীশ্বরবাদী হিন্দু' একটি সোনার পাথরববাটি, একটি ভণ্ড ভাবাদর্শ।
.
হিন্দুত্ব একটা সংস্কৃতির নাম, যা সম্পূর্ণভাবে আধ্যাত্মিক ভাবকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে। যারা এই সংস্কৃতিতে সম্পৃক্ত তারাই হিন্দু; সে যে ধর্মেরই লোক হোক না কেন । হিন্দুধর্মে শাস্ত্র-পরিপন্থী মানুষদের ‘পাষণ্ড’ বলা হয় । পাষণ্ডতা ও নাস্তিকতা সমার্থক ।
.
যেটা আছে সেটাকে স্বীকার করে নেওয়াই হল ‘আস্তিক্য’ । .আর যেটা আছে সেটাকে অস্বীকার করাকে বলে ‘নাস্তিক্য’ । .নাস্তিক্যবাদ একটি দর্শনের নাম । যাতে ঈশ্বর বা স্রষ্টার অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়না এবং যা সম্পূর্ণ ভৌত এবং প্রাকৃতিক উপায়ে প্রকৃতির ব্যাখ্যা দেয় । বস্তুত: আস্তিক্যবাদের বর্জন কেই নাস্তিক্যবাদ বলা যায় । নাস্তিক্যবাদ বিশ্বাস নয় বরং অবিশ্বাস এর ওপর প্রতিষ্ঠিত ।
.
বিশ্বাসকে খণ্ডন নয়, বিশ্বাসের অনুপস্থিতিই নাস্তিক্যবাদের মুখ্য উপজীব্য । ইংরেজি ‘এইথিজম’(Atheism) শব্দের অর্থ হল নাস্তিক্য বা নিরীশ্বরবাদ। Atheist শব্দটি সেই সকল মানুষকে নির্দেশ করে যারা মনে করে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই । পশ্চিমের দেশগুলোতে নাস্তিকদের সাধারণ ভাবে ধর্মহীন বা পরলৌকিক বিষয় সমূহে ‘অবিশ্বাসী’ হিসেবে গণ্য করা হয় । আবার বৌদ্ধ ধর্মের মত যেসব ধর্মে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হয় না, সেসব ধর্মালম্বীদেরকেও নাস্তিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় । উল্লেখ্য, নাস্তিকরা ব্যক্তিগত ভাবে যে কেউ, যে কোন মতাদর্শের সমর্থক হলেও, এদের মিল শুধুমাত্র এক জায়গাতেই, আর তা হল ঈশ্বরের অস্তিত্ব কে অবিশ্বাস করা ।
.
নাস্তিক্যবাদের ভিত্তি মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে । মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কোন মতবাদ দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না । তাই এটা প্রায়ই দেখা যায় যে, আজ যে নাস্তিক, কাল সেই ব্যক্তিই চূড়ান্ত আস্তিক । তাই আমরা সচরাচর কোন আস্তিককে নাস্তিক হতে দেখি না । যে সত্যের স্বাদ পেয়েছে, সে কি আর মিথ্যার ঢিলে মাথা ফাটায় ? কক্ষনো না, কক্ষনো না, এসব কেবল কথার কথা; হাজার চেষ্টা করেও গোলাপফুল ফোটায় না কলমীলতা ।
.
এবার দেখেনি আমাদের দেশের নিরীশ্বরবাদীদের প্রকৃত চিত্রটা । বাস্তবে আমরা যে তথাকথিত নিরীশ্বরবাদীদের দেখি, এরা আস্তিকও নয়, আবার নাস্তিকও নয় । এরা দিনে নাস্তিক্যের বুলী আওড়ায়, ধর্ম সম্পর্কে বলে, “It is the opium of the people", এরা বলে, “Every religious idea and every idea of God is unutterable vileness.” এরা বলে, “Spiritual idea of God decked out in the smartest ideological constumes”। এদের আদর্শ হল, -“The abolition of religion as the illusory happiness of the people is the demand for their real happiness. To call on them to give up their illusions about their condition is to call on them to give up a condition that requires illusions”.
.
কিন্তু রহস্যজনকভাবে এরাই কালীপুজোর রাতে খিচুড়ী-প্রসাদ খেয়ে উপবাস ব্রত ভঙ্গ করে । কোজাগরী লক্ষীপূজায় লুকিয়ে রাত জেগে পাঁচালী পড়ে । আর মাঝে মাঝে তারাপীঠে তারামা কে জবাফুলের মালা পরাতে গিয়ে ধরাও পড়ে । এই মূর্খরা ‘আর্যতত্ত্ব’ ও ‘অনার্যতত্ত্ব’ দিয়ে মানুষে মানুষে ভেদ সৃষ্টি করে, আর ‘শ্রেনীসংগ্রামে’ নেতৃত্ব দেয় ।
.
বিচার করলে দেখা যাবে, এরাই ‘শ্রেনী’ সৃষ্টি করছে, এরাই ‘ভেদ’ রচনা করছে, আবার এরাই ‘শ্রেনী-সংগ্রাম’ নামে একটি ভূয়ো লড়াই তৈরী করছে । এরা ধর্ম-নিরপেক্ষতার দোহায় দেয় বটে, কিন্তু এই পাষণ্ডদের কাছে ধর্ম-নিরপেক্ষতা মানেই হল হিন্দুধর্মের রীতি-নীতিগুলির বিরোধিতা করা । এরা ‘ধর্মতলা’য় গোমাংস খেতে পারে, কিন্তু রাজাবাজারে Pork খাবার সাহস দেখাতে পারে না । আবার এরা তাৎপর্যপূর্ণভাবে মহরম উপলক্ষে হাওড়ার মত গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে বাশা লাঠি বল্লম নিয়ে দৌড়া-দৌড়ি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরব থাকে । এরা দূর্গাপুজো করেনা বটে, তবে ‘দূর্গোৎসব’ পালন করে । আবার ঈদের দিনে ‘ফেজ’ পরে ।
.
আমাদের দেশের নিরীশ্বরবাদীরা বেশিরভাগই ‘তথাকথিত নিরীশ্বরবাদী’ । .ধর্মপ্রাণ মানুষকে যারা বিদ্রুপ করে, তারা 'পাষণ্ড' ছাড়া আর কিছুই নয় । ভারতীয় সংস্কৃতি বা হিন্দু সংস্কৃতির পরিপন্থী এই পাষণ্ডগুলির কোন নীতি নেই । যাদের নীতি নেই তাদের সম্মান নেই । আর যাদের নিজেদেরই সম্মান নেই, তারা অন্য কাউকে অসম্মানিত করবে কি করে ? আসুরীবৃত্তির রুপরেখা রাবণ বা মহিষাসূর কখনো সনাতন ধর্মকে 'কলঙ্কিত' করতে পারেনি, আর তাদের উত্তরসূরীরাও পারবে না ।
.
পরিশেষে বলা যায়, মানুষের জীবন কতকটা 'কাঠ'-এর মত । 'আস্তিক্যবাদ' সেই কাঠকে শুকিয়ে আগুন (জ্ঞানাগ্নী) জ্বালানোর উপযোগী করে তোলে । কিন্তু 'নাস্তিক্যবাদ' সেই কাঠকে ভিজিয়ে দেয় । ভিজে কাঠ কোন কাজে লাগে না ।
.
।।হরি ওঁ তৎ সৎ শ্রীরামকৃষ্ণার্পণমস্তু ।।
Monday, 31 October 2016
পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে। আয়রে ছুটে আয় আয় আয়।।
তাঁর' নাম নিয়ে কত মানুষের হিল্লে হয়ে গেল । কত মানুষ ভবসাগর পার হয়ে গেল । কিন্তু 'ভাগ্নে হৃদে'র কিছুই হল না । 'ভাগ্নে হৃদে' ছিলেন 'ভিজে কাঠ' ।
.
মানুষের জীবন কতকটা 'কাঠ'-এর মত । 'আস্তিক্যবাদ' সেই কাঠকে শুকিয়ে আগুন (জ্ঞানাগ্নী) জ্বালানোর উপযোগী করে তোলে । কিন্তু 'নাস্তিক্যবাদ' সেই কাঠকে ভিজিয়ে দেয় । ভেজা কাঠ কোন কাজে লাগে না ।
.
'আস্তিক্যবাদ' পশুকে 'মানুষ' বানিয়ে দেয় । আর 'নাস্তিক্যবাদ' মানুষকে 'পশু' বানিয়ে দেয় ।
.
যা আছে সেটাকে মেনে নেওয়াই হ'ল আস্তিক্য । কিন্তু যা আছে সেটাকে অস্বীকার করাকে বলে নাস্তিক্য । নাস্তিক্যবাদের ভিত্তিটাই মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে । সুতরাং নাস্তিক্যবাদ দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার আগে আমাদের একবার ভালোভাবে চিন্তা করে নেওয়া উচিত ।
Tuesday, 25 October 2016
যেমন চালাও তেমনি চলি । যেমন বলাও তেমনি বলি ।।
অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য্য
প্রসঙ্গ: অহংকার । ব্যক্তিত্বের অহংকার । ব্যক্তিত্বের অহংকার ঈশ্বর লাভের পথে প্রধান বাধা । যদি তাই-ই হয় তবে অহংকার ত্যাগ করবো কি করে ?
.
কেউ মত্ত ক্লাস নিয়ে, কেউ মত্ত গ্লাস নিয়ে । পার্টি, সোসাইটি, বংশমর্যাদা, আভিজাত্য নিয়েই মেতে আছি আমরা । এই তো সেদিন । সেদিন দেখলাম একটি শব-যাত্রায় কীর্তন হচ্ছে –‘একাই এসেছো ভবে একাই তো যেতে হবে, কেউ তো সঙ্গে যাবে না’ ।.শুনে ভাবলাম, সত্যিই তো ! কেউ আমাদের সঙ্গে যায় না । এমনকি পরনের কাপড়টিও আমাদের খুলে নেওয়া হয় দেহ-দহনের আগে (বিষয়টি নিয়ে দ্বিমত আছে) । কেন? কেননা এখানে পরনের কাপড়টি হল অহং-এর প্রতীক । আমরা এ’জগতে এসেছি বসন-হীন হয়ে, যেতেও হয় সেই ভাবেই ।
.
অহংকার কাকে বলে ?
--------------------------
.
আসলে অহং হলো সেই শাশ্বত আমি । সেই আমি সৎ, চিৎ ও আনন্দস্বরূপ । সেই অহং যখন দেহ দ্বারা আকার লাভ করে, তখনই সেটা অহংকার । সমুদ্রের গভীরে জলভরা কলসি । কলসির ভেতরেও জল, বাইরেও জল । কলসি জলময় । তবুও কলসি’র অস্তিত্ব যায় না । আমাদের ‘আমিত্ব’ও সেই রকম –যতদিন দেহ আছে, ততদিনই ‘আমি’ আছে বা অহং আছে । এই অহং দু’রকমের -‘অস্তিত্বের অহং’ এবং ‘ব্যক্তিত্বের অহং’। ‘ব্যক্তিত্বের অহং’কেই অহংকার বলা যায় । বাড়ী-গাড়ী, টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত প্রভৃতি জড়বস্তু’র প্রতি চাহিদা ও আসক্তি ‘ব্যক্তিত্বের অহং’ থেকেই সৃষ্টি হয় ।
.
‘ব্যক্তিত্বের আমি’ বা ‘ব্যক্তিত্বের অহং’ কিভাবে সৃষ্টি হয় ?
-------------------------------------------------------------------
.
আমাদের আত্মার বাইরের আবরণটি হল বুদ্ধি (inteligence) । ধুলো-বালি থেকে যেমন আয়নার ওপর ‘ছোপ’ পড়ে; তেমনি আমাদের চিন্তাভাবনা(Thaught), আমাদের আদর্শ(Ideology, আমাদের কর্ম-প্রকৃতি(nature of work) আমাদের বুদ্ধির ওপর ‘ছোপ’ ফেলে । এই ছোপটিকে সংস্কার বলা হয় । আমাদের দেহটা একদিন নষ্ট হয়ে গেলেও এই ছোপগুলি আত্মার মধ্যে 'সংস্কার' রূপে থেকে যায় । সোজা ভাবে বলতে গেলে আত্মাকে যদি শরীর ভাবি, তো সংস্কার হল সেই শরীরের অলঙ্কার । গায়ে অলঙ্কার নিয়ে কেউ শুদ্ধ-সত্তার সঙ্গে মিলিত হতে পারে না । আমাদের আত্মা হল প্রকৃতপক্ষে পরমাত্মারই অংশ । কিন্তু সংস্কারাদি থাকার ফলে আমাদের আত্মা পরমাত্মার সঙ্গে এক হতে পারে না । আত্মা পরমাত্মার সঙ্গে লীন হওয়ার জন্যই আমাদের মানবজন্ম । আমাদের অর্জিত সংস্কারকে দূর করার জন্যই আমাদের মানবদেহ ।
.
সংস্কারের স্থূল রূপটি হচ্ছে আমাদের স্বভাব (স্ব-ভাব বা নিজ ভাব) ।.নিরাকার আত্মায় যেটা 'সংস্কার', সাকার দেহে সেটাই 'স্বভাব' ।.এই 'সংস্কার' অনুযায়ী কেউ কুকুরকে ঢিল মারে, আবার কেউবা গোরুকে খেতে দেয় । সবটাই সংস্কার । এক ধোপার ছেলে রাজার ঘরে জন্ম নিল বটে, কিন্তু তার পূর্বজন্মের সংস্কার-বশে স্বভাবটি হল ধোপার । রাজপুত্রর যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা বা ঘোড়সওয়ারী খেলায় কোন মন নেই । এখন সে তার সঙ্গী-সাথীদের সাথে খেলা করলেই বলে, “চলো ভাই আমরা বরং কাপড় কাচা-কাচি খেলা করি”।.সংস্কার থেকে স্বভাব তৈরি হয় ‘ব্যক্তিত্বের আমি’টা হল আমাদের সেই স্বভাবগুলিরই সমষ্টি । এই ভাবেই তৈরি হয় একেকটা পরিচিতি –‘আমি পুরুষ’, ‘আমি নারী’, ‘আমি ডাক্তার’, ‘আমি উকিল’ মায় ‘আমি সাধক’, ‘আমি সন্ত’ ইত্যাদি ইত্যাদি । কিন্তু গণ্ডগোলটা হল যে, আমরা মানবদেহ লাভ করে পূর্বজন্মের সংস্কারকে দূর করা তো দূরের কথা, বরং আরো নূতন নূতন সংস্কার অর্জন করি ।
.
‘ব্যক্তিত্বের অহং’-এর পরিণতি কি ?
দেহকে(‘আমি’) কে ভালবাসলে দেহগত সম্পর্কগুলি গুরুত্ব পায়। আর দেহগত সম্পর্কগুলি গুরুত্ব পেলেই প্রথমে 'আমার মা', 'আমার বাবা', 'আমার বৌ', 'আমার ছেলে', 'আমার বংশ' -এইসব কথাগুলি গুরুত্ব পায় । এরা গুরুত্ব পেলেই পরবর্তী ধাপে 'আমার বাড়ী', 'আমার গাড়ী', 'আমার জমি' -এই সব কথাগুলি মনে গেঁথে যায় । এইভাবে একের পর এক বন্ধন-পাশে বাঁধা পড়ি । সমুদ্র থেকে লবণ পৃথক হয়ে যায় । আর ধ্বণিটিরে প্রতিধ্বনি এক সময় ব্যঙ্গও করতে থাকে (যেভাবে আমরা এখন ঈশ্বরের সমালোচনা করতে নেমেছি, তাতে এর থেকে বেশি আর কি বলা যায়?)।.সব কিছুই হয়ে যায় ‘এক কৌপীন কে ওয়াস্তে’।.লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, আমাদের সমস্যার মূলে আছে আমাদের ব্যক্তিত্বের প্রতি মমত্ব । ব্যক্তিত্বের প্রতি আসক্তি ।
.
এক পরিবারে যেমন দুজন অভিভাবক থাকতে পারেনা, তেমনি এক জগৎসংসারে দুজন কর্তা থাকতে পারে না । দ্বিতীয় অস্তিত্বটি স্বীকার করলেই, মনে প্রথম অস্তিত্বটি বিলুপ্ত হয়ে যায় । জগৎসংসারে এই দ্বিতীয় কর্তাটির অস্তিত্ব সম্পূর্ণ মূর্খতা থেকে আসে । তাই যার ব্যক্তিত্বের অহংকার রয়েছে তার কখনোই ঈশ্বর-লাভ হয় না । ‘ব্যক্তিত্বের অহং’ সবসময়ই নিন্দনীয় । ‘ব্যক্তিত্বের অহং’ ভগবান লাভের পথে একমাত্র প্রতিবন্ধক –যতদিন ‘আমি’ আছে, ততদিন ভগবান নাই’ । .ব্যক্তিত্বের অহং সাধ্য থেকে সাধককে অ-নেক দূরে নিয়ে চলে যায়, যা থেকে একসময় ভগবান বিস্মরণও হয় । ব্যক্তিত্বের অহংকারে মানুষ অন্ধ হয়ে নিজেকে ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়না । ঈশ্বর লাভ তো দুরঅস্ত । শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, " দুই - একটি লোকের সমাধি হয়ে 'অহং' যায় বটে, কিন্তু প্রায়ই যায় না। হাজার বিচার কর, 'অহং' ফিরে ঘুরে এসে উপস্থিত। আজ অশ্বত্থ গাছ কেটে দাও, কাল আবার সকালে দেখ ফেঁকড়ি বেড়িয়েছে”। আমরা এই খোলস দেহটাকে ‘আমি’ বলে ভেবে নিই । এখানেই যত সমস্যা । আমিত্ব বা অহং থেকেই যত প্রবৃত্তি ও তজ্জাত দুঃখভোগের সূচনা । .
.
‘ব্যক্তিত্বের আমি’টি আমরাই অর্জন করেছি । তাই বর্জন করার দায়িত্ব সম্পূর্ন আমাদের । ঈশ্বর-লাভের অভিপ্রায় থাকলে কৌশলে ‘ব্যক্তিত্বের আমি’টিকে নাশ করতে হয় । ‘ব্যক্তিত্বের আমি’ নাশ হলে ‘অস্তিত্বের আমি’ স্বতঃ প্রকাশ্য । নিজেকে ‘অস্তিত্বের আমি’তে প্রতিষ্ঠা করলে তখন আর কর্ম-বন্ধন ঘটে না । তখন প্রচুর ভাল ভাল কাজ করেও নির্লিপ্ত থাকা যায়, যেভাবে নির্লিপ্ত থাকেন মঠ-মিশনের মহারাজরা ।
.
তাহলে উপায় ?
----------------
.
উপায় আছে । সমুদ্রের গভীরে কলসির অস্তিত্ব থাকলেও, সেখানে সমুদ্রেরই প্রাধান্য । কলসিতে কর্তা-ভাব নেই, তাই কলসি সেখানে নিষ্ক্রিয় । অস্তিত্ব থাকলেও যেখানে ব্যক্তিত্বের প্রাধান্য থাকে না, তাকে বলে ‘অস্তিত্বের অহং’ বা ‘অস্তিত্বের আমি’ । ‘অস্তিত্বের অহং’ দোষের হয় না । এতে স্খলনের আশঙ্কাও থাকে না । কেননা, এখানে পরোক্ষে অস্তিত্ব প্রদান কারী প্রভু'কেই Glorify করা হচ্ছে, যা পূজারই নামান্তর । অস্তিত্বের অহং সম্পন্ন মানুষের মনোভাবটি হল “ঈশ্বরই কর্তা, আমি আমি অকর্তা । যেমন চালাও তেমনি চলি, যেমন বলাও তেমনি বলি”। অস্তিত্বের অহং-এর নানা রূপ –কখনো ‘দাস আমি’, কখনো বা ‘সন্তান আমি’ আবার কখনো বা ‘শিষ্য আমি’ । ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলছে্ন “একান্ত যদি 'আমি ' যাবে না, থাক শালা 'দাস আমি' হয়ে। ' হে ঈশ্বর! তুমি প্রভু, আমি দাস' এইভাবে থাকো। ' আমি দাস', ' আমি ভক্ত' এরূপ ' আমিতে' দোষ নাই; মিষ্ট খেলে অম্বল হয়, কিন্তু মিছরি মিষ্টির মধ্যে নয়”।
.
যার ‘ব্যক্তিত্বের অহং’ চলে গেছে, তার অবস্থাটি কেমন হয় ?
ঠাকুর বলছেন “যার ঈশ্বরলাভ হয়েছে, তার অহংকারের দাগমাত্র থাকে, কাম- ক্রোধের আকারমাত্র থাকে; তার বালকের অবস্থা হয়। বালকের যেমন সত্ত্ব, রজঃ, তমো গুণের মধ্যে কোন গুণের আঁট নাই । বালকের কোন জিনিসের উপর টান করতেও যতক্ষণ, তাকে ছাড়তেও ততক্ষণ। একখানা পাঁচ টাকার কাপড় তুমি আধ পয়সার পুতুল দিয়ে ভুলিয়ে নিতে পার। কিন্তু সেই শিশুটিই প্রথমে খুব আঁট করে বলবে ‘না আমি দেব না, আমার বাবা কিনে দিয়েছে’। বালকের চোখে সব্বাই সমান । ইনি বড়, উনি ছোট, এরূপ বোধ নাই । তাই জাতি বিচারও নাই । মা বলে দিয়েছে, ' ও তোর দাদা হয়,' সে ছুতোর হলেও একপাতে বসে ভাত খাবে। বালকের ঘৃণা নাই, শুচি -অশুচি বোধ নাই। পায়খানায় গিয়ে হাতে মাটি দেয় না”
.
অস্তিত্বের অহং-এর নানান রূপ বাস্তবে । ‘সন্তান আমি’ গেয়ে ওঠেন, “মা আছেন আর আমি আছি ভাবনা কি আর আছে আমার”। .আর তাতে ‘দাস আমি’ সুর মিলিয়ে আবেদন করেন, “প্রভু মেরে অবগুণ চিৎ না ধরো”। .আর বীরভক্ত হুঙ্কার দেন, “তারকা চর্বণ করিব । ত্রিভুবন বলপূর্বক উৎপাটন করিব । আমাদের কি জানো না ! আমি রাম-কৃষ্ণদাস!” ‘অস্তিত্বের অহং’ সম্পন্ন ব্যক্তিটি জানে আমার অস্তিত্ব আছে’ –এর দ্বারা এটাই প্রমান হয় যে, আমার ‘অস্তিত্ব’ কারও দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে । সে জানে, তার আশ্রয়দাতার পরিচয়েই তার পরিচয় ।
.
কিন্তু কিভাবে নাশ করব 'ব্যক্তিত্বের আমি' কে?
---------------------------------------------------------
.
ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, “জ্ঞানপথে বিচার করতে করতে অহং যেতে পারে । সে বিচার কেমন ? সে বিচার হল ‘আমি দেহ নই’, ‘মন নই’, ‘আমি জন্ম- মৃত্যুর অধীন নই’, ‘আমি সুখ- দুঃখের অতীত’ ইত্যাদি ভাব নিয়ে নেতি নেতি করে এগিয়ে যাওয়া । কতকটা পেঁয়াজের খোসার মত, পেঁয়াজের খোলসগুলো ছাড়াতে ছাড়াতে শেষে সবের একত্ব বোধ হয়, তখন আর পেঁয়াজ ও পেঁয়াজের খোসার পৃথক অস্তিত্ব নেই -‘দুই’ নেই”। এই ভাবে সাধনা করতে করতে মন যখন সপ্তমভূমিতে পৌঁছায়, তখন মনের লয় হয় এবং সাধকের সমাধি হয় । তখন ‘ব্যক্তিত্বের অহং’ যায় বটে, তবে অহং আবার ফিরেও আসতে পারে । এর বিপদ থেকে সহসা মুক্তি নেই। তাই 'সোহহং' ভাব থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ সাবধান করে দিচ্ছেন। তিনি ' সোহহং' ভাব সম্পর্কে সচেতন করে দিয়ে আরো বলছেন, “গঙ্গারই ঢেউ, ঢেউয়ের গঙ্গা কেউ বলে না। ' আমিই সেই' এ অভিমান ভাল নয়। দেহাত্মবুদ্ধি থাকতে যে এ অভিমান করে, তার বিশেষ হানি হয়; এগুতে পারে না, ক্রমে অধঃপতন হয়।পরকে ঠকায় আবার নিজেকে ঠকায়, নিজের অবস্থা বুঝতে পারে না”।তাই তিনি বলছেন, “আমি' যদি থাকবেই, তাহলে তাকে ঈশ্বরের দাস আমি করে রাখা ভালো । এতে দোষ নাই, বরং এতে ঈশ্বরলাভ হয়”।
.
এছাড়াও ‘ব্যক্তিত্বের আমি’ নাশ করার একটি সহজ উপায় হল: "আমার কিছুই নেই", "আমার কিছুই চাই না", "আমার কারও সঙ্গে কোনও সম্বন্ধ নেই", "আমার আপনজন কেবলই আমার প্রভু” – এই কথা চারটি অভ্যাস করলেই মনে নিশ্চিত ভাবে ব্যক্তিত্বের অহংকার নাশ হবে । প্রথম প্রথম কষ্ট করে অভ্যাস করতে হবে । পরে এই কথাগুলিতে আপনিই বিশ্বাস এসে যাবে । ব্যক্তিত্বের অহংকার সহজে যায় না । ভাবলাম, এই বুঝি জয় করে ফেলেছি । আবার কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে । তাই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সহজ নিদান দিচ্ছেন –“যে আমিটুকু আছে তাকে ‘ভক্তের আমি’ করে রাখো । থাক শালা ভক্তের আমি, দাসের আমি হয়ে”। .কোন জিনিসকে নাশ করতে হলে, সেই বস্তুটিকে আগে চিনে নিতে হয় । তারপর ধ্বংস করতে হয় এবং তারও পর নিকেশ করতে হয় ।
.
উক্ত চারটি কথাকে আচরণে অভ্যাস করলে আমাদের ‘অহংকার’কে সহজেই চিনতে পারব আমরা । অহংকারকে চিনে নিয়ে এবার অভ্যাসের দ্বারা নিজেকে অহংকার থেকে নিরত করতে বা সংযত করতে পারেন । উচ্চ স্তরের মানুষজনের সাথে মেলামেশা করলে, সাধুসঙ্গ করলেও ব্যক্তিত্বের অহংকার কমতে পারে । ব্যক্তিত্ব যতক্ষণ গর্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে, ততক্ষণই ভাল । আমাদের সকলের শ্রীমা বলছেন "চেতনার ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হও তোমরা । যে ভূমিতে ব্যক্তির অস্তিত্ব থাকে, কিন্তু ব্যক্তিত্ব থাকে না, সেই চেতনার ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হও তোমরা । তোমার অস্তিত্ব থাকবে কিন্তু ব্যক্তিত্ব থাকবে না । তবে শান্তি পাবে ।"
.
হরি ওঁ শ্রীরামকৃষ্ণার্পনমস্তু
.
------------------------
দয়া করে লেখাটিকে কেউ কপি-পেষ্ট করবেন না । তাতে ভুল বার্তা যেতে পারে । প্রয়োজনে শেয়ার করুন ।
Friday, 21 October 2016
Saturday, 15 October 2016
পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয়রে ছুটে আয় আয় আয়
যার 'ধবা' নেই তিনিই বিধবা । 'বিধবা' পুরুষ ও নারী উভয়েই হতে পারেন ।অর্থের বোধগম্যতার হেতু পুরুষকে বিপত্নীক বলা হয় মাত্র । বৈধব্যের আচরণবিধি নারীর যেমন আছে, পুরুষেরও তেমনি থাকা উচিত ।